Sunday, February 20, 2022

অর্পিতার বিয়ে

 আন্তরিকতা পরিপুষ্ট বিয়েবাড়ি।


শহরে বাস করে প্রতি বছরই অনেক অনুষ্ঠান বাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাই। সবগুলোই প্রায় কম-বেশি যান্ত্রিক ভাবে। Format-টা এরকম- সাজগোজ করে গেলাম, খুচরো কিছু খাবার, যাকে এখন বলা হয় স্টার্টার, পানীয় সহযোগে খেলাম, পরিচিত মানুষদের সঙ্গে দু'চার কথা হ'ল ব্যস। এর পরেই খাওয়া-দাওয়ার পালা আর বাড়ি ফেরা। আর খাবার মেনু মোটামুটি গতানুগতিক। কখন এলাম, কখনই বা গেলাম সে খবর কেউ জানল না। আমার বাড়ির অনুষ্ঠানেও এর ব্যতিক্রম হয় বলে মনে হয় না। 

কাল একটা বিয়েবাড়ি খেয়ে এলাম। অর্চনার মেয়ে অর্পিতার বিয়ে। বছর পনেরোর এক কিশোরী, অর্চনা আমার বাড়িতে কাজ করতে এসেছিল প্রায় ৩০ বছর আগে। দক্ষিণ বারাসতের এক অজানা গ্রামের বাসিন্দা। কাজে খুব গোছ ছিল। বছর তিনেকের মধ্যে ওর বিয়ে হ'ল। যথারীতি, চার বছরের মধ্যে দু'টি কন্যা সন্তানের মা হ'ল। কাজে ইস্তফা দিয়ে মেয়েদের মানুষ করাতে মন দিল। গরীব মানুষের অনেক দায়। ঘরে বসে থাকলে ওদের সংসার চলে না। তিন বছর বাদে এসে বলল, 'দাদা আমার কাজ চাই'। প্রয়োজন না থাকলেও,  মেয়েটি আমাদের মানসিকতার সঙ্গে এতটাই কাছের হয়ে গেছিল, যে না বলতে পারলাম না। বললাম, যেদিন ইচ্ছে চলে আয়। সেই থেকে অর্চনা আমাদের পরিবারের সদস্য হয়ে গেল। এতটাই ভাল আর বিশ্বাসী, যে আমাদের বাড়ির এক সেট চাবি ওর কাছেই রাখা আছে। গরীব মানুষের নিত্য সঙ্গী অভাব। সেই অভাবের সঙ্গে লড়াই করেই ওদের এগোতে হয়। কাজেই মাঝে মধ্যেই টাকা ধার করতে হয়। নিঃশর্ত টাকা ধার দিয়েছি। কিন্ত সময় লাগলেও সব শোধ করে দিয়েছে।

সেই অর্চনার ছোটো মেয়ে, অর্পিতার বিয়ে ছিল গতকাল। আমাকে অনুরোধ জানালো যেতেই হবে। 

শরীর না দিলেও যথার্থ আন্তরিকতার কাছে আমি সবসময়ই হার মেনেছি। কাজেই প্রায় ১০০ কি মি যাতায়াত করে সকালেই পরিবারের সবাইকে নিয়ে বিয়েবাড়ি ঘুরে এলাম।

 শহুরে বিয়ের আয়োজনে একবার ফিরে আসব। নয়তো লেখাটার সার্থকতা থাকবে না। একটু উচ্চবিত্ত পরিবারের অনুষ্ঠানে reception থেকে বিদায় পর্যন্ত সব কিছুর দায়িত্ব সামলাচ্ছে এজেন্সি, যাদের পোশাকি নাম Event manager. ত্রুটির কোনো অবকাশ নেই। চূড়ান্ত পেশাদারিত্বের ছোঁয়া। নিমন্ত্রিত অতিথিরা যান gift দিতে আর দেঁতো হাসিতে দু-চারজনের সঙ্গে গালগল্প বুনে, অবশ্যই ভূরিভোজ করে ফিরে আসা। ফেরার সময় গৃহকর্তা উদ্ভাসিত মুখে প্রশ্ন করেন, "সব ঠিকঠাক ছিল তো !"। ক্ষেত্রবিশেষে আমার উত্তর হয়, " একটু বেশি ঠিক ছিল।" কারণ আড়ম্বরে সত্যিই কোনো ত্রুটি চোখে পড়ে না এবং উনি ওটাই শুনতে চান। যাইহোক, আমি এমন কথা এখনও বলতে পারছি কারণ আমার বাড়ির অনুষ্ঠানে এখনও Event Manager-রা ঢুকতে পারেনি। আসলে আধুনিক যান্ত্রিক জীবনে যান্ত্রিকতার প্রতি আনুগত্য কলকব্জার মতো অজান্তেই নিজেদের মধ্যে নিঃশব্দে ঢুকে পড়েছে। ফলে, নির্বিকারত্ব, আবেগহীনতা, ভালবাসাহীনতার প্রকাশ ঘটছে অহরহ। তথাকথিত  আলোকপ্রাপ্ত সমাজের অতিথি সেবার এটাই রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্পিতার বিয়েতে  আড়ম্বর ছিল তাদের আর্থিক সীমা লঙ্ঘন না করে। তবে আন্তরিকতায় পরিপুষ্ট। ঘন্টাচারেক কাটিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে চোখে জল এসে গেছিল। জীবনে কদাচ হলেও এই আবেগঘন মুহূর্তগুলো আসে বলেই মনে হয় বেঁচে থাকাটা এখনও সার্থক, অন্তত আমাদের মানসিকতার মানুষের। আমার গ্রাম বাঙলা আমাদের পুরোনো পরম্পরাকে আজও ধরে রেখেছে যা শহুরে মানুষ ভুলেই গেছে। অর্চনার বাড়ি ঘুরে এসে মনে হ'ল পরিশ্রম মানুষের আর্থিক সচ্ছলতাকে কোন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়, এবং সে তখনও যথার্থ মানুষের মতোই ব্যবহার করে। 

অর্চনারা শুনে রাখ, সুখে-দুঃখে তোদের পাশে আমাদের পরিবারকে সব সময় পেয়ে যাবি। আমরা থাকব না। আমার ছেলে-বৌ আছে তো !

No comments: